
#শুভজিৎ দাস, রায়গঞ্জ: শ্রমিক স্বার্থে টাকা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গতকাল থেকেই উত্তপ্ত রায়গঞ্জের শ্রমিক রাজনীতি। আর সেই বিতর্কের মধ্যেই আজ অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে সামিল হলেন রায়গঞ্জ পৌর বাসস্ট্যান্ডের বাস চালক, কন্ডাক্টর-সহ শ্রমিকরা। ফলে সকাল থেকেই ব্যাহত বাস পরিষেবা। সমস্যায় পড়েছেন সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে প্রতিদিনের নিত্যযাত্রীরা।

শ্রমিকদের অভিযোগ, শ্রমিক কল্যাণ সমিতির নামে শ্রমিক স্বার্থে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছিল। কিন্তু বিষয়টিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘তোলা আদায়’ বলে প্রচার করে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে বাস মালিক সংগঠন। এর প্রতিবাদেই কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত বলে দাবি শ্রমিকদের।
ঘটনার সূত্রপাত রায়গঞ্জ পৌর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসকর্মীদের কাছ থেকে কুপনের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের অভিযোগকে ঘিরে। বাস মালিক সংগঠনের দাবি, প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে ১০ টাকা এবং প্রতিটি গাড়ির পিছনে ৩০ টাকা করে অর্থ নেওয়া হচ্ছিল। এই ঘটনায় অনিমেষ চক্রবর্তী ওরফে দুলাল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়।

বাস মালিক সংগঠনের সম্পাদক প্লাবন প্রামাণিকের অভিযোগ, শ্রমিক স্বার্থের কথা বলে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে জেলাশাসক এবং রায়গঞ্জ থানার আইসির কাছেও অভিযোগ জানানো হয়েছে বলে দাবি তাঁর। তবে কার নির্দেশে এবং কোন সংগঠনের নামে টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছিল, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

যদিও অভিযুক্ত অনিমেষ চক্রবর্তী অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি নিজে ওই কুপন তৈরি করেননি। বঙ্গীয় মজদুর সংঘের (বিএনএস) পক্ষ থেকেই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।

অন্যদিকে, বিএনএস-এর সাধারণ সম্পাদক চঞ্চল চন্দ্র দাস বাস মালিক সংগঠনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁদের শ্রমিক সংগঠন এই ধরনের টাকা সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত নয়। পাল্টা মালিকপক্ষের বিরুদ্ধেই ‘চেইন সিস্টেমে’ টাকা তোলার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিকদের বক্তব্য, তাঁদের সংগৃহীত অর্থ শ্রমিকদের কল্যাণ ও স্বার্থরক্ষার জন্যই নেওয়া হচ্ছিল। তাঁদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে মালিকপক্ষের তরফে তাঁদের বিরুদ্ধে ‘তোলা আদায়’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেই অভিযোগের প্রতিবাদেই তাঁরা কর্মবিরতির পথে গিয়েছেন।

শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বাস মালিকদের তরফে ‘ওয়েলফেয়ার’ বা ‘চেইন’-এর নামে টাকা নেওয়া হয়। সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে খরচ করা হয়, তার হিসাব শ্রমিকদের জানানো হয় না বলেও অভিযোগ তাঁদের।

যদিও বাস মালিক সংগঠনের সম্পাদক প্লাবন প্রামাণিক রবিবার দাবি করেন, আগাম কোনও আলোচনা বা নোটিস ছাড়াই এভাবে কর্মবিরতি ডাকা ন্যায়সঙ্গত নয়। ‘চেইন’-এর টাকা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ওই অর্থ বাস মালিকেরাই দেন, শ্রমিকরা নন। ফলে সেই অর্থের হিসাব শ্রমিকদের দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পাশাপাশি, বাস মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনও নির্দিষ্ট সংগঠন বা শ্রমিকের নামে অভিযোগ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং কর্মবিরতিকে ঘিরে রায়গঞ্জের বাসস্ট্যান্ড চত্বরের পরিস্থিতি এখন যথেষ্ট উত্তপ্ত। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাস পরিষেবায়। অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির জেরে সকাল থেকেই সমস্যায় পড়েছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে দূরপাল্লা ও দৈনন্দিন কাজে বাসের উপর নির্ভরশীল মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
শ্রমিক ও মালিকপক্ষের এই টানাপোড়েনের মধ্যে দ্রুত সমাধান না হলে আগামী দিনে রায়গঞ্জের বাস পরিষেবা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং বাস পরিষেবা স্বাভাবিক করার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে।



