
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির অন্যতম রত্ন ছিল খন গান। আজ তা প্রায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু সেই বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে এগিয়ে এসেছেন ভগীলতা হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক বিন্দুবিকাশ বর্মন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরিশ্রমের ফলস্বরূপ তিনি লিখে ফেলেছেন খন শিল্পীদের ইতিহাস—যেখানে খন পালাগানের নানা রূপ, ধারা এবং শিল্পীদের অবদান লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

লেখক জানান, বিশিষ্ট খন শিল্পী খুশি সরকার ও অমল চন্দ্র বর্মণের মতে খন পালাগানকে মূলত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়—শাস্ত্রীয় সংক্রান্ত খন (যেমন ব্রহ্ম শ্বরী, মায়া বন্ধকী), সামাজিক ঘটনা সংক্রান্ত খন (যেমন হাজি কেনহে পাজি সাধু কনহে সইতান), এবং ঐতিহাসিক ঘটনা সংক্রান্ত খন (যেমন তে ভাগা, সাঁওতাল বিদ্রোহ)।

এছাড়াও সামাজিক ঘটনা নির্ভর খন পালাগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—সমাজ অস্বীকৃত ঘটনা ভিত্তিক (যেমন ভাসুর ভাসুয়ানি খন, হাউসের বেহাই রসের বেহানি) এবং সমাজ স্বীকৃত ঘটনা ভিত্তিক (যেমন গবিনের সংসার, নয়ন জ্বলি অন্ধ স্বামী)।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন কিছু খন পালাও সৃষ্টি হয়েছে, যা সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেমন—চল পড়িবা যাই (শিক্ষা সংক্রান্ত), নির্মল বাংলা (স্বাস্থ্য সংক্রান্ত), ছট সংসার (পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত), মরণ ফাঁদ (এডস বিরোধী প্রচার)।

বইটিতে লেখক তুলে এনেছেন একাধিক খন শিল্পীর নাম—খুশী সরকার, অমল চন্দ্র বর্মন, গণেশ রবিদাস, মহেন্দ্র বর্মন, অঞ্জলী রায়, বাংকা বর্মন, কার্তিক চন্দ্র বর্মন, রমেশ চন্দ্র বর্মন, সুরেন্দ্র নাথ রায়, প্রীতি রায়, নরেশ চন্দ্র সরকার প্রমুখ। তাদের কণ্ঠ ও অবদান ছাড়া খন গানের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

গত মঙ্গলবার বিকেলে রায়গঞ্জের লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বইটির প্রকাশ হয়। দিনটি ছিল ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার তিরোধান দিবস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চানন বর্মা সেবা সমিতির সম্পাদক শ্যামাপদ রায় সহ এলাকার বহু বিশিষ্টজন। বই প্রকাশের এই মুহূর্তে একটাই প্রত্যাশা—খন গানের ভান্ডার হয়তো আবার নতুন প্রজন্মের কাছে উন্মোচিত হবে, আর হারাতে বসা এক অমূল্য সংস্কৃতি ফিরে পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা।








