
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ উত্তর দিনাজপুর, মালদার সীমানায় ছোট্ট গ্রাম মারনাই। নিস্তব্ধতায় মোড়া এই গ্রাম যেন প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নরাজ্য। তবে এই গ্রাম এখন খ্যাতি পেয়েছে এক মানুষকে ঘিরে—অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অক্ষয় চন্দ্র পাল। বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে পড়া দেহ, কিন্তু চোখে-মুখে এক অদম্য দৃঢ়তা। কারণ, তিনি লড়ছেন তাঁর প্রিয় অতিথিদের জন্য—দূরদেশ থেকে আসা পরিযায়ী পাখিদের বাঁচাতে।


নিজের পৈতৃক ভিটেয় বিঘাখানেক জমিতে সারি সারি বড় বড় গাছ লাগিয়েছিলেন বহু বছর আগে। তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করেননি যে একদিন এই গাছগুলো আশ্রয় দেবে হাজার হাজার পাখিকে। আজ সেই গাছের ডালে ঝাঁকে ঝাঁকে বসে থাকে ওপেন বিল স্টর্ক, ইগরেট, আর নানা প্রজাতির অতিথি পাখি। যেন তাঁর গাছগুলোই হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত পাখি-আশ্রয়শিবির। অক্ষয়বাবুর চোখে সেই দৃশ্য প্রাণভরে দেখার আনন্দ থাকলেও, বুকের ভিতর লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য ভয়—চোরাশিকারীদের হামলা।

“প্রায় পনেরো বছর ধরে এই পাখিরা এখানে আসছে। এ বছর এসেছেন প্রায় ২৪০০ অতিথি। ওরা যখন বাচ্চা দেয়, সংখ্যা আরও বাড়ে। তখনই চোরা শিকারের ভয়টা সবচেয়ে বেশি হয়,” বলছিলেন অক্ষয়বাবু। কণ্ঠে উদ্বেগ, কিন্তু লড়াই ছাড়ার ক্লান্তি নেই।

চোরাশিকারীদের তৎপরতা রুখতে প্রশাসনের দ্বারস্থও হয়েছেন তিনি। কিন্তু সাড়া মেলেনি তেমন। “পুলিশকে জানিয়েছি বহুবার, কিন্তু কাউকে ধরতে দেখিনি। তাই একাই লড়ছি,” কণ্ঠে ক্ষোভ। তবুও তিনি আশার আলো দেখছেন। গ্রাম্য তরুণদের কয়েকজন এগিয়ে এসেছেন তাঁর পাশে। আবার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাখি বিশেষজ্ঞ টি.কে. রায়ও তাঁর এই সংগ্রামের সঙ্গী হয়েছেন।

মারনাই গ্রামে এখন বিকেলের আকাশে ভেসে বেড়ায় হাজার ডানার শব্দ। গ্রামবাসীরা বলেন, এই দৃশ্য দেখলেই মনে হয় যেন প্রকৃতি এখানে আশীর্বাদ বর্ষণ করেছে। অথচ এত সৌন্দর্যের মাঝেও অক্ষয়বাবুর চোখে ঘুম নেই। তিনি বারবার প্রশাসনের কাছে আর্জি জানিয়েছেন পাখিদের সুরক্ষার জন্য। তাঁর কথায়, “ওরা যদি এই অতিথিদের পাশে না দাঁড়ান, তাহলে জেলার সুনামই নষ্ট হবে।”

একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাঁর জীবনের শেষ পর্বে আনন্দের চেয়ে দায়িত্বই বড় হয়ে উঠেছে। পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় বানানোর স্বপ্নে তিনি দিনরাত ব্যস্ত। হয়তো ঠিক সেভাবেই গ্রামের নাম ছড়িয়ে পড়ছে দূর দূরান্তে। মানুষের লোভের আঁধারে তিনি এক প্রদীপ জ্বালিয়েছেন—যাতে আগামী দিনের প্রজন্মও দেখতে পায় এই অতিথি পাখিদের রঙিন আকাশ।






