
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ ভারতে শিশু অপুষ্টির সংকট এখনও বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে জর্জরিত জেলাগুলিতেই সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত—এমনই উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরেছে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের সাম্প্রতিক গবেষণা। তাঁদের দাবি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান সংক্রান্ত কাঠামোগত ঘাটতিগুলির কার্যকর সমাধান না করা হলে দেশের পুষ্টি সূচকের উন্নতি অসমই থেকে যাবে। ২০২৫ সালের নভেম্বর সংখ্যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন BMC Public Health জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, জেলাভিত্তিক ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে শিশু অপুষ্টির সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পার্থ দাস, তমাল বসু রায়, তনু দাস, প্রিয়া দাস ও শুভদীপ সাহা এবং সিধো কানহো বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি গবেষণা বিভাগের ড. সমীরণ বিসাই—এই যৌথ গবেষণায় NFHS-5–এর তথ্য ও নীতি আয়োগের মাল্টিডাইমেনশনাল পভার্টি ইনডেক্স (MPI) প্রগতি পর্যালোচনা ব্যবহার করা হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের খর্বকায়তা (Stunting), কৃশতা (Wasting) ও কম ওজনের (Underweight) পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, যে জেলাগুলিতে দারিদ্র্যের বোঝা সবচেয়ে বেশি, সেখানেই দীর্ঘস্থায়ী শিশু অপুষ্টির ঝুঁকি সর্বাধিক।

বিশ্লেষণে মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, বিহার, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, এই অঞ্চলগুলি কার্যত “দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতার যুগপৎ সংকটের হটস্পট”। স্বাস্থ্যপরিষেবার সীমিত সুযোগ, দুর্বল স্যানিটেশন, অপর্যাপ্ত ও অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, মাতৃস্বাস্থ্যের অবনতি এবং আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা—সব মিলিয়েই এখানকার শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষণায় গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলিকে ‘হাই প্রায়োরিটি ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সেখানে বাড়তি সরকারি বিনিয়োগ, শিশুস্বাস্থ্য সূচকের কঠোর নজরদারি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বিশেষত দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় নারী ও শিশুদের জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক ও মোবাইল স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে পুষ্টিমুখী সরকারি প্রকল্পগুলিকে আরও শক্তিশালী করা, জেলা স্তরে জনস্বাস্থ্য খাতে আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ দপ্তরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, শিশু অপুষ্টি শুধুমাত্র খাদ্য বা পুষ্টি সংকটের সমস্যা নয়। যে শিশু বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের পরিবেশে বেড়ে ওঠে—অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, অনিরাপদ পানীয় জল, সীমিত শিক্ষা ও অনিশ্চিত আয়ের মধ্যে—তার জীবনের প্রতিবন্ধকতা খুব অল্প বয়সেই শুরু হয়। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলির সমাধান না হলে পুষ্টি সূচকের অগ্রগতি ধীরগতির ও অসমই থেকে যাবে।

দারিদ্র্যের গভীরতার সঙ্গে স্থায়ী শিশু অপুষ্টির সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করে এই গবেষণা ভারতের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গবেষকদের সতর্কবার্তা—উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব না দিলে অপুষ্টি ও প্রজন্মান্তর বৈষম্যের দুষ্টচক্র আরও শক্তিশালী হবে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক মানব উন্নয়ন প্রক্রিয়ায়।






