
#আনন্দ ব্যানার্জী, কলকাতা: চোখে জল, আকাশে উড়ছে লাল-হলুদ স্কার্ফ, আর এক রাতেই যেন মিলিয়ে গেল দুই দশকের সমস্ত যন্ত্রণা। অবশেষে ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষে ফিরল ইস্টবেঙ্গল। দীর্ঘ ২২ বছর পর আবারও জাতীয় লিগ জয়ের স্বাদ পেল লাল-হলুদ ব্রিগেড। বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গনে স্নায়ুচাপের আইএসএল ২০২৫-২৬ ফাইনালে ইন্টার কাশীকে ২-১ গোলে হারিয়ে ভারতের চ্যাম্পিয়ন হল ইস্টবেঙ্গল।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেসে যায় গোটা স্টেডিয়াম। কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, কেউ অবিশ্বাসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। চারদিক কাঁপিয়ে উঠল “ইস্টবেঙ্গল, ইস্টবেঙ্গল” ধ্বনিতে। নায়ক হয়ে উঠলেন মহম্মদ রশিদ। ৭২ মিনিটে তাঁর করা জয়সূচক গোলই ইতিহাস গড়ে দেয়। এর আগে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ইউসেফ এজেজ্জারি দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সমতা ফেরান। ইন্টার কাশীর হয়ে ১৪ মিনিটে আলফ্রেড প্লানাস গোল করে এগিয়ে দিয়েছিলেন দলকে। কিন্তু ৫০ মিনিটে এজেজ্জারির গোল ম্যাচে ফিরিয়ে আনে ইস্টবেঙ্গলকে।

এই জয়ের ফলে ১৩ ম্যাচে ২৬ পয়েন্ট নিয়ে লিগ তালিকার শীর্ষে শেষ করল অস্কার ব্রুজ়নের দল। সমান পয়েন্টে শেষ করেও গোলপার্থক্যে পিছিয়ে পড়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকতে হল মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে। স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লিকে ২-১ গোলে হারালেও গোলপার্থক্যে পাঁচ গোল এগিয়ে থেকে বহু প্রতীক্ষিত জাতীয় লিগের শিরোপা নিজেদের করে নিল ইস্টবেঙ্গল। তবে ম্যাচের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। বিশাল প্রত্যাশার চাপ যেন স্পষ্টভাবেই অনুভূত হচ্ছিল লাল-হলুদ শিবিরে। ম্যাচের শুরুতেই চমকে দেয় ইন্টার কাশী।

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল ইস্টবেঙ্গল। এজেজ্জারি ও মিগেল ফিগেইরা দূরপাল্লার শটে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৪ মিনিটে খেলার গতির বিপরীতে গোল পেয়ে যায় ইন্টার কাশী। ডেভিড মুনোজের লম্বা বল ইস্টবেঙ্গলের বক্সে ভেসে আসে। নিখুঁত টাইমিংয়ে সেই বল ধরে প্রথম টাচেই দুরন্ত ভলিতে জালে পাঠান আলফ্রেড প্লানাস। প্রবসুখন গিলের কোনও সুযোগই ছিল না। মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা স্টেডিয়াম। কিছুক্ষণের জন্য যেন আবার ভয় ঢুকে পড়েছিল সমর্থকদের মনে। এত কাছে এসেও কি আবার হাতছাড়া হবে স্বপ্ন?

তবে দ্রুত ম্যাচে ফেরার সুযোগ এসেছিল ইস্টবেঙ্গলের সামনে। ২২ মিনিটে বিপিন সিংহের বাড়ানো দুর্দান্ত ক্রসে সামান্য ছোঁয়া লাগালেই গোল ছিল নিশ্চিত। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে খুব কাছ থেকে বল বার উড়িয়ে দেন এজেজ্জারি। সেই সুযোগ নষ্টের পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ইন্টার কাশী। প্লানাস বারবার সমস্যায় ফেলছিলেন ইস্টবেঙ্গল রক্ষণকে। ২৪ মিনিটে অনোয়ার আলিকে কাটিয়ে তাঁর জোরালো শট গিল কোনওমতে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন।

৩৫ মিনিটে আরও বড় বিপদে পড়েছিল ইস্টবেঙ্গল। প্লানাসের দূরপাল্লার শট গিলের হাত ফসকে বেরিয়ে এলেও রিবাউন্ড থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয় ইন্টার কাশী। কিছুক্ষণ পর তম্বা সিংহের শটও দুর্দান্তভাবে বাঁচান গিল। গ্যালারিতে তখন স্পষ্ট নার্ভাসনেস। প্রথমার্ধের শেষদিকে মরিয়া হয়ে আক্রমণে ওঠে ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু শেষ মুহূর্তের ধার ছিল না আক্রমণে। তারপরই আসে ম্যাচের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। দ্বিতীয়ার্ধে একেবারে বদলে যাওয়া দল হিসেবে মাঠে নামে ইস্টবেঙ্গল। ৫০ মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকেই অনবদ্য থ্রু পাস বাড়ান অনোয়ার আলি। সেই বল ধরে ডেভিড মুনোজকে গতি দিয়ে পিছনে ফেলে এগিয়ে যান এজেজ্জারি। গোলকিপার শুভম ধাসকে কাটিয়ে ঠান্ডা মাথায় জালে বল জড়িয়ে দেন মরোক্কোর তারকা।

মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয় কিশোর ভারতী। স্বস্তি বদলে যায় বিশ্বাসে। ইতিহাস যেন হাতছানি দিতে শুরু করে। সমতা ফেরানোর পর পুরো বদলে যায় ম্যাচের আবহ। প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি আক্রমণকে গর্জনে স্বাগত জানাচ্ছিল হাজার হাজার সমর্থক। ৬১ মিনিটে বদলি নন্দকুমারের জোরালো শট থেকে এগিয়ে যাওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। তবে শুভম ধাস দুর্দান্ত সেভ করে দলকে বাঁচান। অবশেষে ৭২ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিপিন সিংহের ডানদিক থেকে ভেসে আসা দুরন্ত ক্রসে পা ছুঁইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন মহম্মদ রশিদ।

তারপর আর আবেগ ধরে রাখা যায়নি। বেঞ্চ ফাঁকা হয়ে যায়। উচ্ছ্বাসে ব্যারিকেড টপকে পড়েন সমর্থকরা। গর্জনে কেঁপে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। তবুও শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত উদ্বেগ ছিলই। একদিকে ইস্টবেঙ্গলের মরিয়া রক্ষণ, অন্যদিকে মোহনবাগানের ম্যাচের আপডেট—প্রতিটি মুহূর্ত যেন অনন্ত সময়ের মতো মনে হচ্ছিল। অবশেষে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ২২ বছরের অপেক্ষা, হতাশা আর বেদনা মিলিয়ে গেল এক নিমেষে। ভারতীয় ফুটবলের সিংহাসনে আবারও ফিরল ইস্টবেঙ্গল।




