
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির গন্ধ থেকে শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মান-২০২৬ পাচ্ছেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. দীপক বর্মণ। তাঁর এই সম্মানে স্বাভাবিকভাবেই খুশি ও গর্বিত তাঁর জন্মভূমি কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার রাজারকুঠি গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ও সাহিত্য মহল।

আগামী ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ কুচবিহার রেড ক্রস ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিতাস চ্যারিটেবল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. দীপক বর্মণের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হবে। তুফানগঞ্জ থানার অধীন আসাম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত রাজারকুঠি গ্রামে জন্ম অধ্যাপক ড. দীপক বর্মণের। পাশের গ্রাম দ্বিপেরপার। কুচবিহারের রাজ-ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই অঞ্চল থেকেই তাঁর শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের সূত্রপাত।

বর্তমানে তিনি রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। অধ্যাপক বর্মণ একাধারে শিক্ষক, গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক। বাংলা ও রাজবংশী—দুই ভাষার সাহিত্যচর্চায় তাঁর সমান আগ্রহ। কুচবিহারের এ.বি.এন. শীল কলেজ থেকে Y2K-তে সাম্মানিক স্নাতক হওয়ার পর ২০০২ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর UGC-NET JRF অর্জন করে গবেষণায় যুক্ত হন। গবেষণারত অবস্থাতেই ২০০৬ সালের আগস্টে রায়গঞ্জ কলেজে লেকচারার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৫ সালে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে অধ্যাপক পদে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

তাঁর Ph.D. গবেষণার বিষয় ‘কল্লোল যুগের কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গীয় জীবনের আত্মরূপ অনুসন্ধান’। কথাসাহিত্য, কবিতা এবং লোকসংস্কৃতি তাঁর গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল, সাহিত্য পত্রিকা এবং দৈনিক সংবাদপত্রে তাঁর গবেষণাধর্মী ও সৃজনশীল লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ২০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র আয়োজনের পাশাপাশি প্রায় ২৫টি সেমিনারে গবেষণাপত্র উপস্থাপন, আমন্ত্রিত বক্তা ও সেশন চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

অধ্যাপক বর্মণের প্রকাশিত কবিতার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ন্যানো গ্রাম বিষ’ ও ‘দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি’। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘কল্লোলযুগের কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গীয় জীবন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘চিয়ায়িত বাংলা কবিতা : বিবিধ বৈচিত্র্যে’, ‘রাইগঞ্জের ইতিহাস’ এবং ‘ভাষা-সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি ও সময়ের অভিঘাত’-এর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড। ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য পত্রিকা ‘চয়ন’-এর অন্যতম সম্পাদকও তিনি।

গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে সাতজন গবেষক পিএইচ.ডি. এবং তিনজন এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তাঁর তত্ত্বাবধানে পাঁচজন পিএইচ.ডি. গবেষক গবেষণারত।

তাঁর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিও মিলেছে একাধিকবার। ২০২৩ সালে SAARC Cultural Society, Bangladesh Chapter-এর পক্ষ থেকে তিনি ‘রায় সাহেব পঞ্চানন বর্মা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং একই বছরে রায়গঞ্জের ‘চৈতন্য সাহিত্য পত্রিকা’র পক্ষ থেকে ‘চৈতন্য সাহিত্য সম্মান’ লাভ করেন।

শুধু শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি অধ্যাপক বর্মণ। দীর্ঘ প্রায় দশ বছর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় সেবা প্রকল্পের (NSS) প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে সামাজিক সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি রায়গঞ্জ পঞ্চানন বর্মা সেবা সমিতির সহ-সভাপতি। শতাব্দীপ্রাচীন রায়গঞ্জ ক্ষত্রিয় হস্টেল কমিটির সদস্য হিসেবেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কার্যকালে ২০১০ সালে মনীষী ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা প্রতিষ্ঠিত ক্ষত্রিয় সমিতির শতবর্ষ উদ্যাপন এবং স্মরণিকা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি রায়গঞ্জের বকুলতলায় ঠাকুর পঞ্চানন বর্মার আবক্ষ মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রত্যন্ত রাজারকুঠির মাটি থেকে উঠে এসে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. দীপক বর্মণের এই দীর্ঘ পথচলা আজ নতুন সম্মানে ভূষিত হতে চলেছে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর কুচবিহারে ‘শিক্ষাজ্যোতি’ সম্মান গ্রহণের মুহূর্ত তাই তাঁর জন্মভূমি রাজারকুঠি থেকে রায়গঞ্জ—উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষের কাছেও নিঃসন্দেহে গর্বের দিন।



