
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায়, ভারতে মধ্যবয়সী ও প্রবীণদের মধ্যে হৃদরোগের সম্ভাব্যতা বা ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণার শেষে এমন দাবি করলেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষকেরা। গবেষণার এই দলে আছেন গবেষক শুভদীপ সাহা, প্রিয়া দাস, তনু দাস, পার্থ দাস এবং ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড তমাল বসু রায়। সম্প্রতি গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়েছে গ্লোবাল সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার নামক বিশ্বখ্যাত জার্নালে।

গবেষকদলের পক্ষে শুভদীপ সাহা বলেন, ভারতে বয়স্ক জনগণের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে নানা ধরনের অসংক্রামক রোগের প্রভাব।ভারতের লংগিটিউডিনাল এইজিং স্টাডি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালের তথ্যের ভিত্তিতে ২০৫০ সালের মধ্যে ৪৫ বছর বা তার ঊর্ধ্বে বয়স্ক জনগণের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৪১.৫ মিলিয়নে। মানুষের জীবনকাল বৃদ্ধির পেছনে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে, এই দীর্ঘায়ু জীবনের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং অক্ষমতার ঝুঁকিও। উন্নয়নশীল দেশগুলো, যার মধ্যে ভারতও রয়েছে, ক্রমশ অসংক্রামক রোগের দিকে এগোচ্ছে। এটি প্রধানত বয়স্ক জনগণকে প্রভাবিত করছে। দলের পক্ষে অধ্যাপক ড তমাল বসু রায় বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, ভারতে মোট মৃত্যুর ৫৩% ঘটছে অসংক্রামক রোগের কারণে, যার মধ্যে একমাত্র হৃদরোগ (Cardiovascular Diseases বা CVDs)-এর কারণেই ২৪% মৃত্যু হচ্ছে। এক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ মানুষ হৃদরোগজনিত কারণে প্রাণ হারায়, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন (GDP)-এর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি জানান, উচ্চ আয়ের দেশগুলিতে হৃদরোগ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে তাদের উপর এই রোগের বোঝা অপেক্ষাকৃত কম হয়। উন্নত দেশগুলোতে, অ-সংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, ক্যানসার, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (সিভিডি), এবং শ্বাসযন্ত্রের রোগে প্রায় ৮০% প্রবীণ মানুষের মৃত্যু হয়। বিভিন্ন গবেষণায় হৃদরোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, স্থূলতা এবং অসংযত জীবনধারার কথাও বলা হয়েছে।

তবে, ফিনল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যদি মানুষ নিয়মিত হেঁটে অফিসে যায়, সাইকেল ব্যবহার করে বা দ্রুত হাঁটে, তাহলে তারা সিভিডি থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকতে পারে। তাঁর মতে, ভারতে সামগ্রিক ভাবে অনিদ্রা, উচ্চ ঘনত্বের কোলেস্টেরল, হাইপারটেনশন,তামাকজাত নেশা, স্থুলতা, রক্তচাপ, অ্যালকোহল সেবন হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হৃদরোগ সংক্রান্ত চিত্র আলাদা হলেও, জাতীয় স্তরে এই রোগ ও বয়স্ক জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে সিভিডির প্রাদুর্ভাব আরও বাড়বে—যদি না এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ভারতে একই ধরনের ঘটনার উপস্থিতি ও তার জন্য দায়ী প্রধান কারণগুলোর বিস্তারিত এখনো সম্পূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হয়নি। তবে, গবেষণার ফলাফল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবীণ ভারতীয়দের মধ্যে হৃদরোগ (CVDs)-এর ব্যাপকতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে যে নেতিবাচক মানসিক অবস্থা, দুর্বল সামাজিক-পারিবারিক পটভূমি এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—এই সবকিছুর সঙ্গে হৃদরোগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব হৃদরোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি।






