
#চন্দ্র নারায়ণ সাহা, রায়গঞ্জঃ ডিম থেরাপি খেয়ে করনদিঘীর প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা গৌতম পালের পালানোর ছবি ভাইরাল। আর সেই ঘটনার পরই কলম ধরলেন একদা গৌতম পালের হাতে প্রহৃত অধ্যাপক সুদেব রায়। গৌতম পালকে উদ্দেশ্য করে দীর্ঘ আবেগঘন লেখা লিখলেন তিনি। সেখানে অতীতের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করে সুদেব রায় লিখেছেন, গৌতম পালের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর আনন্দ হচ্ছে না, বরং তাঁর দুই সন্তানের কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যমে লেখা সেই দীর্ঘ বার্তায় শুরুতেই সুদেব রায় লিখেছেন, “না গৌতম, না! তোমার এই পরিণতি দেখে একটুও আনন্দ পাচ্ছি না। সত্যি বলছি কষ্ট হচ্ছে.. খুব কষ্ট হচ্ছে!” এরপরই উঠে এসেছে ২০১৩ সালের ২৭ আগস্টের সেই ঘটনার কথা। সুদেব রায়ের অভিযোগ, পরীক্ষার হলে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি মেনে না নেওয়ায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি শারীরিকভাবে নিগৃহীত হন।

সুদেব রায়ের দাবি, শিক্ষক হিসেবে পরীক্ষায় নকল বা অসদুপায় অবলম্বন দেখেও তিনি চোখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি। তাঁর কথায়, ছাত্রছাত্রীদের অন্যায় থেকে বিরত রাখতে গিয়ে তিনি নিজেই অনেক বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতেন। লেখায় তিনি দাবি করেছেন, ওইদিন তৎকালীন প্রিন্সিপাল স্বপ্না মুখার্জির চেম্বারে গৌতম পাল তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাঁকে যেন “একটু দেখা হয়”। কিন্তু সুদেব রায় সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বক্তব্য, পরিচিত কাউকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে দিলে বরং তাঁর উপরেই বেশি নজর পড়বে এবং পরীক্ষার হলে অনিয়ম হলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।

এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ সুদেব রায়ের। তাঁর দাবি, পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী পম্পা পাল পরীক্ষায় নকল করার চেষ্টা করলে তিনি সেই নকলের কাগজ নিয়ে সতর্ক করেন। পরে কলেজের অধ্যক্ষা বিষয়টি দেখেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেন। সুদেব রায়ের অভিযোগ, এরপরই একদল লোক পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢুকে তাঁকে এবং কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে অধ্যাপিকা সেঁজুতির চোখে ঘুষি মারার অভিযোগও। তিনি আরও দাবি করেছেন, তাঁকেও দীর্ঘক্ষণ শারীরিকভাবে নিগৃহীত করা হয়েছিল এবং ঘটনায় তিনি সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

তবে সেই ঘটনার থেকেও যে বিষয়টি তাঁকে বেশি আঘাত করেছিল, তা হল সহকর্মীদের ভয় পাওয়া। সুদেব রায় লিখেছেন, হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় তাঁর দুই সহকর্মী তাঁকে দেখতে এসেছিলেন, কিন্তু হাসপাতালের সামনের দরজা দিয়ে নয়—পেছনের জানালা দিয়ে। নিজের অপমানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি লিখেছেন, কর্তব্য পালন করতে গিয়ে শরীরে আঘাত পেলেও সেই আঘাতকে তিনি মনের মধ্যে ঢুকতে দেননি। কিন্তু সহকর্মীদের সেই ভীত-সন্ত্রস্ত আচরণ তাঁকে গভীরভাবে অপমানিত করেছিল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রসঙ্গে এসে লেখাটির সুর সম্পূর্ণ বদলে যায়। গৌতম পালের সন্তানদের কথা উল্লেখ করে সুদেব রায় লিখেছেন, বাবা-মাকে হেনস্থার শিকার হতে দেখলে সন্তানদের কতটা কষ্ট হয়, তা তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানেন। নিজের ছয় বছরের সন্তানের স্মৃতিও তুলে ধরেছেন তিনি। হাসপাতালে থাকার সময় সন্তান কীভাবে তাঁর ছবি বুকে নিয়ে ঘুমাত—সেই কথা স্মরণ করে সুদেব রায় লিখেছেন, সেই সময় রাগের বশে যদি কখনও তিনি গৌতম পালকে অভিশাপ দিয়েও থাকেন, আজ তাঁর মনে হয় সেই অভিশাপ আসলে গৌতমের সন্তানদের উপরেই ফিরে এসেছে।

তাই গৌতম পালের বর্তমান পরিস্থিতিতে আনন্দ না পেয়ে বরং কষ্টই হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। শেষে গৌতম পাল এবং তাঁর মতো অন্যদের উদ্দেশ্যে সুদেব রায়ের আবেদন, “আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করো। যে যে পাপগুলো করেছো তা স্বীকার করো। শাস্তি ভোগ করো। পূত-পবিত্র হয়ে সন্তানের কাছে ফিরে এসো।” একইসঙ্গে প্রতিহিংসার রাজনীতি যাতে নতুন করে আরেকটি ‘পাপচক্র’ তৈরি না করে, সেই আবেদনও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, অতীতের রাগ বা প্রতিশোধের বশে যেন কেউ নতুন করে আরেকজন ‘গৌতম পাল’ বা ‘পম্পা পাল’-এ পরিণত না হন। তাঁর বার্তার মূল সুর—অপরাধের বিচার হোক আইনের পথে, প্রতিশোধের পথে নয়।




